তালিবুল ইলম সুপারস্টার্স
অনুবাদইলমফিতনা
মাসুদ শরীফ


কে ভেবেছিল “তালিবুল-‘ইলম”-এর সাথে একদিন যুক্ত হবে রোশনাই আর জৌলুস? কেই-বা ভেবেছিল “জ্ঞানের ছাত্র” হওয়া একসময় পরিণত হবে বহু মুসলিমের ধ্যানজ্ঞানে? নিজেকে পরিচিত করার নতুন ফ্যাশন হবে আমি একজন “দায়ি”? এক হয়ে যাবে জাহিলিয়্যাহ যুগের “নাচিয়ে” আর ইসলামি “জ্ঞানের ছাত্র”?
শুরুর আগে বড় করে দাবিত্যাগ করে নিচ্ছি: জ্ঞান অন্বেষণ, অন্বেষণকারী কিংবা এমন কোনো বিষয়ের সমালোচনা নয় এই লেখাটি। বরং অধুনা মুসলিম সমাজে উচ্চাকাঙ্ক্ষী যেসব শিক্ষার্থীরা রয়েছে, জ্ঞান অন্বেষণের পেছনে তাদের মূল প্রণোদনা এবং কীভাবে তারা সেই জ্ঞান অন্বেষণ করছে সেগুলোই এই লেখার মূল বিষয়।
মুসলিম হয়েও পশ্চিমা সমাজে ইসলামবিহীন পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে এমন কিছু লোককে আপনি অনুকরণ করেন, আপনাকে নিয়ে যাদের কোনো মাথাব্যথাই নেই। তাদের অনুকরণে আপনি গ্যাংস্টারদের মতো পোশাক-আশাক পরতেন, কানে ইয়ারফোন গুঁজে সারাদিন র্যাপ মিউজিক শুনতেন, গলির মোড়ে বন্ধুদের সাথে এক হয়ে মশকরা করতেন মেয়েদের নিয়ে। এরপর বাসায় গিয়ে কোরমা-পোলাও খেয়ে রাত জেগে নিতেন পরীক্ষার প্রস্তুতি। কমবেশি এভাবেই পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রভাবে আমাদের বেড়ে ওঠা।
আসলে মানুষ সেলিব্রেটিদের মতো হতে চায়—যাদের মানুষ সমাদর করে, বাহবা দেয়। যারা বিখ্যাত তাদের অনুকরণ করতে চায়। আমার মনে হয় টাকা-পয়সার চেয়ে মানুষ তাকে কী মনে করবে, এটাই তাকে মূল প্রেরণা দেয়। তাই প্রতিটা লোকই চায় মানুষ তাকে সম্মান করুক, তার প্রতি মনোযোগ দিক।
উম্মাহর মধ্যে কারা মুসলিম সমাজের মনোযোগ কাড়ছে, ইসলামি শিক্ষার্থীরা তাদের দৃষ্টান্ত দেখে। এদের লেকচার সিডি-ডিভিডিতে পাওয়া যায়। তারা বিভিন্ন স্থানে লেকচার দেন, ক্লাস নেন; লোকে তাদের সমাদর করে।
মনে আছে একবার এক কনভেনশনে গিয়েছিলাম। কনসার্টে প্রিয় কোনো শিল্পীর আগমনের পূর্বে সবাই যেমন হাপিত্যেশ করে, সেই কনভেনশনে এক স্পিকারের কথা শোনার জন্য মানুষগুলো ঠিক সেভাবেই উন্মুখ হয়ে ছিল।
মুসলিমরা তাদের জাহিলিয়্যাহ কালের কিছু চাওয়া-পাওয়া বাদ দেওয়ার পর সেগুলো “হালাল” কোনো কিছু দিয়ে বদলে নিতে চায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের কাজে দ্রুত পরিবর্তন এলেও নিয়ত অনেকের পেছনেই পড়ে রয়। জ্ঞান অন্বেষণের গুণ অনেক—জ্ঞানের পথের অভিযাত্রী হওয়ার জন্য ওগুলোই যথেষ্ট। তবে এই পথ চলতে গিয়েই বেরিয়ে আসে নানান কিসিমের সব চোরাফাঁদ: মনোযোগ আকর্ষণ, খ্যাতি, মানুষের সাথে তর্ক, “জ্ঞানী” হিসেবে “জানাশোনা” হওয়া, যে জিনিস শেখায় কল্যাণ নেই সেগুলো শেখা—এমন আরও কত কী। যেসব আলিমরা “একই বিষয়” নিয়ে কথা বলেন, তাদের খুব সহজেই এড়িয়ে যাওয়া হয়। ওদিকে যে বিষয়টি আপনি কখনো শোনেননি, সেইসব মহান বিষয় নিয়ে যারা নিজেদের জড়িত রাখেন কিংবা বিতর্কিত ইস্যুগুলোতে দৃঢ়ভাবে নিজেদের জাহির করেন, তাদের প্রতি সহজেই আপনি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
জ্ঞানী কিংবা বিদ্যার জাহাজ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার মুলোই একজন জ্ঞান অন্বেষণকারীর নিয়তে গুবলেট পাকানোর জন্য যথেষ্ট। এমনকি নারীরাও উচ্চাকাঙ্ক্ষী জ্ঞান অন্বেষণকারীদের জন্য অনেক বড় ফিতনাহ। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে যেসব পুরুষরা সম্মানিত, নারীরা ছোটে তাদের পেছনেই। এ ধরনের মানসিকতাসম্পন্ন “ছাত্রদের” জন্য নারী বিষয়টি বেশ রুচিদায়ক; জ্ঞান অন্বেষণের পেছনে অনেক বড় “প্রেরণা”। অনেকে মনে করেন “জ্ঞানের ছাত্র” হলে বিয়ের সম্ভাবনা তরতর করে বেড়ে যাবে; স্ত্রীর সংখ্যা ৪টির মধ্যে রাখতেই যেন হিমশিম খেতে হবে।
আর এভাবেই “জ্ঞানের ছাত্র” উপাধি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে শ্রদ্ধা অর্জন, মানুষের প্রশংসা অর্জন, নারী আর কিছুটা হলেও টাকা কামানোর মিশনে। এটা কি “নাচিয়ে” জীবনধারার হালাল সংস্করণ নয়?
মূল চিত্রটা হয়তো এতটা বাজে নয়। অধিকাংশ ছাত্ররা (বিশেষ করে তরুণরা) বেশিরভাগ সময় তাদের নিজেদের নিয়ত নিয়ে দোটানায় থাকে। দীনের জ্ঞান অর্জনের পথে অভিযাত্রা নিঃসন্দেহে অনেক মহান, অনেক পবিত্র। কিন্তু বড় লক্ষ্যের সাথে আসে বড় প্রতিবন্ধকতা—আর সেইসব বড় প্রতিবন্ধকতার মধ্যে প্রধান পরীক্ষা হলো আমাদের নিয়তের পরীক্ষা। জাহান্নামে প্রথম যে তিন ব্যক্তিকে ফেলা হবে সে সংক্রান্ত হাদিসটি আমরা সবাই জানি। এদের মধ্যে দুজন হলো আলিম ও কুরআন তিলাওয়াতকারী (আল্লাহ আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন)। নিয়ত ঠিক করা তাই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। দীন শেখার নেপথ্যে আমাদের মূল লক্ষ্য পুনরায় যাচাই করে দেখতে হবে। বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা ঠিক করে সঠিক পন্থায় পড়াশোনা করতে হবে।
জ্ঞান অন্বেষণ করতে গিয়ে আমরা ভুল পথে যাচ্ছি কি না সেটা বোঝার উপায় কী?
আল-কুরআনে নবি ﷺ-কে আদেশ করা হয়েছে নিজের জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দুয়া করতে। কিছু কিছু হাদিসে আমরা পাই তিনি কল্যাণকর জ্ঞানের জন্য দুয়া করতেন। এমনকি কিছু কিছু হাদিসে আমরা দেখি যেসব জ্ঞান কোনো কাজের না সেগুলো থেকে তিনি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। তো উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছাত্রদের মনোযোগ কি কল্যাণকর জ্ঞানের দিকে?
কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইসলামে অগ্রাধিকার বিবেচনা করে কাজ করতে হয়। যেমন, আইশাহ (রা.) বলেছেন মদ পান নিষিদ্ধ করার এই আদেশ যদি ইসলামে প্রথমে দেওয়া হতো, তাহলে কেউ ইসলাম গ্রহণ করত না। বাদ দেওয়ার জন্য তাদের একটা ধারাবাহিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অনুরূপভাবে দীন শেখার ক্ষেত্রেও প্রথমে আপনাকে মৌলিক ও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোতে দক্ষতা অর্জন করতে হয়। এরপর এগোতে হয় জটিল বিষয়গুলোতে।
আপনি যা শিখছেন সেটা কি আপনাকে আল্লাহর কাছে নিয়ে আসছে?—ইসলামিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি একটি লিটমাস টেস্ট।
দীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছাত্রদের জন্য এটা কি মানানসই—
আকিদাহ, বিদআহ, ইলমের উচ্চতর ও ইজতিহাদি বিষয়ে বিতর্কে জড়ানো? এসব বিষয়ে সত্যিকারের জ্ঞানের ছাত্রদের সাথে তর্ক করা? অথচ দীনের এই ছাত্রদের হয়তো সঠিক তাজবিদের সাথে কুরআনটা ঠিকমতো পড়ার বাইরে ইসলাম নিয়ে তেমন আর কোনো পড়াশোনা নেই। কিংবা জুয ‘আম্মা ছাড়া কুরআনের আর কোনো অংশ তাদের মুখস্থ নেই। তাহলে কীভাবে তারা এসব বিষয়ে তর্কে জড়াতে পারে?
সালাহর আরকান যারা ঠিকমতো বলতে পারেন না, তারা যখন অন্যের সাথে সালাহতে কীভাবে আঙুল নাড়াবে সেই ফিকহ নিয়ে আলোচনা করে, তখন ব্যাপারটা কেমন দাঁড়ায়?
মাওলিদ (মিলাদ) কিংবা তাওয়াসসুলের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলোর সমর্থনে ঝাঁপি খুলে বসেন, অথচ যে ইবাদতগুলো নিয়ে কোনো তর্কের অবকাশ নেই সেগুলোর দিকে মানুষকে ডাকেন না?
সুজূদে হাত আগে নাকি হাঁটু আগে—এই নিয়ে দিন-মাস গবেষণা করেন অথচ ওজু করার জন্য কী ধরনের পানি ব্যবহার করা অনুমোদিত সেটাই বলতে পারেন না? ফিকহের ন্যূনতম মৌলিক জ্ঞানটুকুই নেই তাদের।
অন্য মুসলিমের ব্যাপারে রায় দিয়ে দেওয়া, তাকে বিদআতি বলা কিংবা তার আকিদাহ/মানহাজ ঠিক নেই এমন দাবি করা। অথচ আমাদের এই ছাত্রটি হয়তো শিরক ও কুফরের মধ্যে পারিভাষিক পার্থক্যটুকুও জানেন না।
এ ব্যাপারটাই-বা কেমন, যারা ফিকহি ইস্যুতে ওয়ালা ও বারা প্রয়োগ করে মোজার ওপর মাসাহকারীর পেছনে সালাহ আদায় করেন না? কিংবা যারা “বাইরের মাংস” খান তাদের বর্জন করে চলেন?
“স্টুডেন্ট অফ নলেজ কালচার” কিছু লোককে আজব কিছু তকমার সাথে জুড়ে দিয়েছে। আপনি হয়তো মসজিদে দেখবেন কিছু লোক আসহাবুল-হাদিসের (হাদিস অনুকারী) গুণাবলি নিয়ে আলোচনা করছে। নিজেদের বলছে হাদিসের ছাত্র। তারা হয়তো অধ্যয়ন করছে হাদিসের বর্ণনাকারীদের নিয়ে উচ্চতর বিষয়ের কোনো বই—তথাপি, এরা হয়তো সিহাহ সিত্তার কোনো একটি বইও প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিজে পড়ে শেষ করেননি। কোনো শাইখের কাছে পড়া তো দূরের কথা। কেউ কেউ দাবি করেন তিনি প্রথাগত ইসলাম অনুসরণ করেন। অথচ যে প্রথাগত ইসলাম অনুসরণের দাবি তিনি করেন, সেই ইসলামের বুনিয়াদি উসুল ও দলাইলই হয়তো তার পড়া হয়নি। তা সত্ত্বেও তারা নিজেদের এতটাই ধার্মিক ও জ্ঞানী মনে করেন যে, যারা তাদের পথ অনুসরণ করেন না, তাদের অবজ্ঞা করতে একটুও বাধে না।
অনেকে “জ্ঞানের ছাত্র” হতে গিয়ে দীনের মৌলিক বিষয় শেখাকে অগ্রাহ্য করে উচ্চতর ইখতিলাফি বিষয়ে বেশি আগ্রহ দেখায়। নির্দিষ্ট একটি ড্রেস-কোডের সাথে নিজেদের সংশ্লিষ্ট রাখে। ড্রেস-কোড? জোব্বা, সাউদিদের মতো মাথায় কুফি, হাঁটু ও গোড়ালির মাঝে পরা প্যান্ট। কঠোরভাবেই এসব ড্রেস-কোড অনুসরণ করেন। আবার ওদিকে আলিমদের বিধান ও রায় নিয়ে আলোচনা আর তর্কে মাতেন। অথচ কখনো হয়তো এসব আলিমদের মূল লেখা চোখেও দেখেননি। কিংবা এসব ছাত্ররা কেবল নিজেদের শিক্ষকদের শেখানো আজকার আওড়ান, সুন্নাহয় পাওয়া দোয়াগুলোতে চোখ বুলিয়েও দেখেন না।
বিশাল সংখ্যক মুসলিম ছাত্র জ্ঞানের প্রথম পর্যায়ের মালভূমিতে বিচরণ করেন। তারা মনে করেন তারা সব জানেন। “অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী”—কথাটা প্রায় সবারই জানা। জ্ঞানের উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছানোর নিয়ত অবশ্যই মহৎ। ইসলামিক জ্ঞানের উচ্চতর বিষয়ের পিয়াস মেটাতেই মানুষের আগ্রহ বেশি, বিশেষ করে যেটা মুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয়। মাংসটা হালাল না হারাম এটা নিয়ে সবাই তর্ক করতে চায় কিন্তু এর জন্য যে উসুল বা প্রমাণাদি জানা দরকার, সেগুলো কেউ অধ্যয়ন করতে চান না। সবাই কুরআনের তাফসির করতে চান, কিন্তু কুরআন মুখস্থ করার সময় কারও হয় না, এমনকি প্রতিদিন তিলাওয়াত করারও না।
ব্যাপারটা বেশ আশ্চর্যজনক। “দীনের ছাত্র” হিসেবে অনেক লোকই আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অথচ দীনের বুনিয়াদি বিষয়গুলোই তারা এড়িয়ে চলেন। কুরআনের সাথে তাদের কোনো প্রাত্যহিক সম্পর্ক নেই। এটি হিফয করার জন্য নেই কোনো সঠিক পরিকল্পনা।
দীন শিখতে গিয়ে কিছু পরিমাণে ঔদ্ধত্যও ভর করে আমাদের মাঝে। মৌলিক বিষয়াদি বাদ দিয়ে “আকর্ষণীয়” বিষয়ের পেছনে ছোটাই আমাদের মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়। কারণ এতে করে আপনি অনেক বিষয়ে অন্যান্যদের ভুল ধরে অবজ্ঞা করতে পারবেন। আমি নিজেই জানতাম কোনো একটা কাজ বিদআহ এবং অন্যদের তাতে জড়াতে দেখলে ভীষণ রেগে যেতাম। পরে যখন বিষয়টি নিয়ে কোনো শাইখের অধীনে পড়াশোনা করলাম, তখন দেখলাম বিষয়টি নিয়ে অন্যান্য প্রমাণ, অভিমত ও ব্যাখ্যা আছে। এগুলো প্রমাণ করে যে কাজটা বিদআহ নয়। নিদেনপক্ষে কাজটা এমন কিছু নয় যাতে রক্ত গরম করা উচিত। আপনি আমাদের সমাজে এমন কত লোককে দেখেন যারা এ ধরনের বিষয় নিয়ে “যুদ্ধে” লিপ্ত? এসব কথিত “বিদআতি” কাজের কারণে একে অপরের ছায়া মাড়ান না? মহামারীর আকার ধারণ করার আগেই এর প্রাদুর্ভাব দূর করতে হবে। দীনের জ্ঞান অন্বেষণে ‘অগ্রসর’ হওয়ার পথে সমাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে দেখলে বুঝবেন কেউ এই ভুল পথে পা বাড়িয়েছে। বাকি সবাইকে তারা নিচু চোখে দেখা শুরু করে। সবকিছুকে অগ্রাহ্য করতে শুরু করে, যেন সামাজিক কাজ তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। মুখে না বললেও তাদের কাজে এটা ঠিকই প্রকাশ পায়। আর এমন করেই দীনের জ্ঞান জীবনের ব্যাপ্তির পরিসর থেকে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানের মাঝে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।
এ ধরনের কার্যাবলির একটি লক্ষণ হলো শুইভিদা। শুধু ইন্টারনেটভিত্তিক দাওয়াহ। আমাদের মধ্যে এমন অনেক লোক আছে যারা মসজিদভিত্তিক ও সামাজিক দাওয়াহ বাদ দিয়ে কেবল ইন্টারনেটে দাওয়াহ কাজ করেন। আমি বলছি না যে অনলাইনে দাওয়াহ হয় না, বা এ ধরনের কিছু একেবারেই নেই—এমনকি এই প্রবন্ধটিও তো একটি ব্লগে ছাপা। কিন্তু শুইভিদা আক্রান্ত লোকেরা তাদের সারাটা ক্ষণ আটকে আছেন বিভিন্ন ফোরামে, চ্যাটরুমে, আর অনলাইন মন্তব্যের জালে। এই মন্তব্য থেকে ওই মন্তব্যে, এই চ্যাটরুম থেকে ওই চ্যাটরুমে নিরন্তর ঘুরে বেড়ান তারা। অন্যকে তকমা দেওয়া, বর্জন করা, বারবার নতুন করে পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা—এগুলোয় এখন ছেয়ে গেছে চারপাশ। সমাজ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে বেছে নিয়েছেন অন্য আলিমদের বিভিন্ন তকমা দিয়ে বেড়ানোর দায়িত্ব। দাওয়াহর নামে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া করার দায়িত্ব। নিঃসন্দেহে এটা শয়তানের প্রবঞ্চনা। এটা এমন এক জিনিস যা হৃদয়কে কঠিন করে ফেলে। অনলাইন দাওয়াহর ব্যাপক সম্ভাবনা আছে ঠিকই, কিন্তু সেটাকে সঠিক উপায়ে কাজে লাগাতে হবে। কেউ যদি বাস্তব জীবনে দাওয়াহ কার্যক্রমের সাথে যুক্ত না থাকেন, তাহলে আমি জোর দিয়েই বলব, অনলাইন দাওয়াহতেও তিনি কখনো সফল হতে পারবেন না।
দীন শেখার ব্যাপারে আমাদের বাস্তবিক হওয়ার সময় এসেছে। কীভাবে জ্ঞান অন্বেষণ করতে হবে, এর পদ্ধতি, গুণাবলি এসব নিয়ে আলাদা বই-ই আছে। তবে ধর্মীয় জ্ঞান অন্বেষণের ক্ষেত্রে যে দুটো বৃহত্তর সমস্যা আমাদের মোকাবিলা করতে হয়, সেগুলোর প্রতি আমি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই: ১. নিয়ত ২. ধৈর্য
আমরা যারা প্রকৃত অর্থে দীনের জ্ঞানী হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করি, আমাদের নিয়তকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বারবার যাচাই করে নিতে হবে। আমাদের দীন শেখার উদ্দেশ্য কী? অন্যের সাথে তর্ক করা? লোকের সমাদর পাওয়া? বই লিখে কিংবা লেকচার দিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা? নাকি দীন শেখার উদ্দেশ্য সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া? মানুষের কল্যাণ করা? যদি এটাই আমাদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের কাজেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে। সেটা শেখার প্রতিই আমাদের মনোযোগী হতে হবে যেটা আমাদের আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়।
যারা জ্ঞানের মোহে জ্ঞান শেখে, তারা সবসময় বিধিবিধানের মধ্যে ফাঁকফোকর খুঁজে ফিরবে নিজেদের কাজকে প্রমাণ করার জন্য। আপনি তাকে মৌলিক বিষয়ের কথা বললে তারা খুঁজে খুঁজে এমন আলিম বের করবে যিনি তাজবিদ সহ বিশুদ্ধভাবে কুরআন আবৃত্তি করতে পারেন না। হাজারো আলিমদের মাঝে চিরুনি অভিযান চালিয়ে এমন একজন আলিমের দৃষ্টান্ত এনে আপনার সামনে উপস্থাপন করবে যিনি কুরআন মুখস্থ করেননি। আমাদের মধ্যে এক কদম পেছানোর সদিচ্ছা থাকতে হবে। নিজেদের পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। মৌলিক বিষয় রপ্ত করায় কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। কাজটা বিরক্তিকর লাগলেও প্রকৃত অধ্যয়নের জন্য এটুকু ত্যাগ আমাদের করতেই হবে।
মৌলিক বিষয়গুলো রপ্ত করতে বড্ড ধৈর্যের প্রয়োজন। লক্ষ্যের ব্যাপারে আমাদের উচিত বাস্তবিক হওয়া। আমরা কি বিদ্বান হতে চাই? সেজন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো কি আছে আমাদের? ব্যাপারটা এভাবে ভেবে দেখুন, আপনি যদি আপনার সেক্যুলার পড়াশোনায় খারাপ করতে থাকেন, ঠিকমতো ক্লাস করতে না পারেন—ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার বেলায় কেন এমন হবে না? পূর্ণকালীন ইসলামি পড়াশোনা করার জন্য অন্তত ৬-৮ বছর সময় ও সামর্থ্য কি আছে আপনার? সেক্যুলার পড়াশোনা কিংবা চাকুরির সাথে যুগপৎভাবে পূর্ণকালীন দীনের ছাত্র হওয়া প্রায় অসম্ভব।
আপনি যদি খণ্ডকালীন পড়াশোনা করার জন্য তৈরি থাকেন, তাহলে এই সত্য মেনে নেওয়া উচিত যে আপনি বড় কোনো আলিম হতে পারবেন না। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে আপনার মনোযোগ কি মুসলিম সমাজের একজন কল্যাণকামী সদস্য হওয়ার দিকে ফেরাতে পারবেন? সেটা হতে পারে একজন ভালো খতিব হওয়া, হালাকাহয় দীন শেখানো, মুসলিম সমাজের জন্য কাজ করা বা উম্মাহর প্রয়োজনে অন্যান্য কাজ করা। আমাদের অনেক আলিম দরকার, কিন্তু যেটা আমাদের দরকার না সেটা হচ্ছে কেউ নিজেকে আলিম মনে করে নিজেই নিজেকে ধোঁকা দেবে। এতে করে সে শুধু নিজেই লক্ষ্যচ্যুত হবে না, একই সাথে উম্মাহকেও কোনো সাহায্য করতে পারবে না।
যে বিষয়ে আপনার আগ্রহ সেটা নয়, বরং আপনার জন্য যেটা জানা জরুরি আপনি কি সেটার দিকে মনোযোগী হতে ইচ্ছুক? আমাদের মতো খণ্ডকালীন ছাত্ররা প্রায়ই একটা সমস্যায় পড়ে। কেউ হয়তো আরবি শিখতে চান। অবশ্যই ভালো লক্ষ্য। তারা আগামী ২-৩ বছর তাদের সমস্ত অবসর সময় সরফ, নাহও, বালাগাহ ও অন্যান্য ব্যাকরণগত বিদ্যা বিস্তারিতভাবে শেখার পেছনে ব্যয় করবে। কিন্তু ২-৩ বছর পর তারা কেবল মৌলিক কিছু ইসলামিক বই পড়ার পর্যায়ে পৌঁছাবে, যে বইগুলো ইতোমধ্যেই মাতৃভাষায় বিদ্যমান।
আপনি কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে চান সেটা বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতে শনাক্ত করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞানী হওয়া বা চর্চাকারী মুসলিম হওয়াতে কোনো সমস্যা নেই—কিন্তু সবাইকেই স্কলার হতে হবে এমন নয়। কত শত লোক ৫-৬ বছর ধরে তাদের স্বপ্নের পিছে ছোটেন। এই সময়টাতে আর কিচ্ছু করেন না। এভাবেই হয়তো তার বয়স ত্রিশ হয়ে গেছে, কিন্তু সত্যিকার কোনো ইসলামিক শিক্ষা এখনো হয়ে ওঠেনি। এমনকি কোনো পূর্ণাঙ্গ সেক্যুলার শিক্ষাও না। “বাইরে পড়াশোনা করবে” এমন সুযোগের অপেক্ষায় থেকে বর্তমান সময়টাতে অনেকে কিছুই করেন না—এমনকি কুরআনটাও মুখস্থ করেন না। স্থানীয় নির্ভরযোগ্য আলিমের অধীনেও কোনো পড়াশোনা করেন না। এমনকি ন্যূনতম ডিগ্রির জন্য ইউনিভার্সিটিতে যাওয়াও বন্ধ করে দেন! এ ধরনের লোকেরা ৫ বছর পরও সেই একই বিষয় নিয়ে তর্ক করেন যা নিয়ে তারা ৫ বছর আগেও করেছিলেন।
একজন আলিম কিংবা দায়ি হওয়ার মধ্যেই একজন দীনের ছাত্রের জীবন ঘুরপাক খেতে হবে—এমন ধারণা অমূলক। উম্মাহর লোকেরা যদি দীন শিখে নিজেরা এক একজন চর্চাকারী মুসলিম হয়ে উঠতেন, তাহলে আমাদের সমাজের অবস্থা কত সুন্দর হতো! ভেবে দেখুন সব ডাক্তার, আইনজীবী, শিক্ষক, ব্যবসায়ীরা চর্চাকারী মুসলিম—তারা সবাই আল্লাহর ব্যাপারে সদাসচেতন। তাদের পরিবারকে তারা তাকওয়ার আদলে গড়ে তুলছেন। সন্তান শিক্ষা, সম্পদ ব্যয় বা পারস্পরিক আচার-ব্যবহার—প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা তাকওয়ার চর্চা করছেন। কী চমৎকার এক মুসলিম সমাজই-না হতো সেটা! পুরো সমাজের ইসলাম চর্চা ও সামগ্রিক জ্ঞানের মাত্রা তখন অন্য পর্যায়ে পৌঁছে যেত।
আমরা বাস্তব লক্ষ্য ঠিক করার পর সে অনুযায়ী কাজও করতে হবে। আল্লাহর কাছে দুয়া করতে হবে আমরা যেন শুধু জ্ঞান বহনই না করি, সে অনুযায়ী কাজও করি। যদি আমরা সেটা করতে পারি, তাহলে যারা বছরের পর বছর সময় ঢেলে দিয়েছেন এবং এখন দীন শেখাচ্ছেন, সেসব তালিবুল ইলমদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যাবে। শ্রদ্ধা বাড়বে আমাদের স্থানীয় ইমামদের ওপর, যাদেরকে প্রায়ই অবজ্ঞা করা হয়।
আমরা যা শিখছি সেটা যেন আমাদের হৃদয়কে সযতনে গড়ে তোলে। একটা বই পড়ার আগে বা লেকচার শোনার আগে আমাদের জিজ্ঞেস করা উচিত কেন আমরা সেটা পড়ছি। কাজটা শেষ হওয়ার পর ভাবা উচিত এ থেকে আমরা কী শিখলাম যা আমাদের আখিরাতের জন্য কল্যাণকর হবে এবং যা দিয়ে আমরা অপরের উপকার করতে পারব।
দীনের ব্যাপারে আরও জ্ঞানী হতে হলে আগে আমাদের নিজেদের কাছে সৎ হতে হবে। আল্লাহর প্রতি আমাদের আন্তরিকতা কতটুকু, সেটা যাচাই করা জরুরি। সফল হতে চাইলে এই কাজগুলো আমাদের করতেই হবে। সুফিয়ান আস-সাওরী অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেছিলেন, “আমরা আল্লাহ বাদে অন্য কারণে জ্ঞান শেখা শুরু করেছিলাম, কিন্তু আল্লাহ ছাড়া আর কারও উদ্দেশ্যে যে জ্ঞান শেখা হয় না!”
আমাদের অনেকেই নানা উদ্দেশ্য নিয়ে জ্ঞান শেখা শুরু করে। যাত্রাপথে সেই উদ্দেশ্যের রূপবদল হয়। আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে ইনশাআল্লাহ, নিয়ত বিশুদ্ধ করার জন্য ও জ্ঞানের প্রকৃত বাহক হওয়ার জন্য আল্লাহ আমাদের তাওফিক দেবেনই।
আশা করি প্রবন্ধটা কেউ ভুল বুঝবেন না এবং কেউ জ্ঞান অন্বেষণে আশাহত হবেন না। সঠিক কর্মপন্থা ও বিশুদ্ধ নিয়ত অনুযায়ী আমরা এগোচ্ছি কি না, সেটা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যই এই লেখা। জীবনের যে পর্যায়েই আমরা থাকি না কেন, এমনকি বুড়ো বয়সেও আমরা আমাদের জ্ঞানের পথের অভিযাত্রা শুরু করতে পারি। শুধু সেই পথ চলতে গিয়ে সঠিক আদব বজায় রাখার জন্য আমাদের সর্বোচ্চ সচেষ্ট হতে হবে।
আলহামদু লিল্লাহ, ইসলাম শেখার জন্য আজ অনেক পথ খোলা। অনলাইন প্রোগ্রাম, রেডিও-টেলিভিশন, সেমিনার বা হালাকাহ—কত সুযোগ আমাদের সামনে। সেগুলোর সম্ভাব্য সর্বোত্তম ব্যবহার করা উচিত যাতে আমরা এমন বিষয় শিখতে পারি যা আমাদের আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যাবে।
শেষ করছি সবাইকে এই বইটি পড়ার অনুরোধ জানিয়ে: সালমান আল-আওদাহর “The Pitfalls in the Quest of Knowledge”। আমি যে কথাগুলো এখানে বলতে চেয়েছিলাম, সেগুলোই আরও সুন্দরভাবে শায়খ এই বইটিতে তুলে ধরেছেন।
মূল: ইব্ন উমার
মূল লেখার লিংক: muslimmatters.org/2008/03/10/keeping-it-real-student-of-knowledge-superstars/
যে-বই এখন পড়ছি
কিছু বলতে চাইলে লিখুন মন খুলে…
© ২০২৫। সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত।


Book of Humour
Ruskin Bond
কী চাচ্ছিলেন?
